Table of Contents
Toggleআয়কর কমাতে কোথায় বিনিয়োগ করবেন ? Investment Tax Rebate Bangladesh ২০২৬-২০২৭
বাংলাদেশে আয়কর প্রদান একটি নাগরিক দায়িত্ব। তবে আইনসম্মতভাবে আয়কর কমানোও একজন সচেতন করদাতার অধিকার। সঠিক খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বৈধভাবে আয়কর রেয়াত (Investment Tax Rebate) সুবিধা নিতে পারেন এবং একই সাথে নিজের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারেন।
বর্তমানে অনেকেই জানতে চান —
“কোথায় বিনিয়োগ করলে ট্যাক্স কমবে?”
অথবা
“কোন কোন বিনিয়োগে আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়?”
এই লেখায় আমরা আলোচনা করবো:
- Investment Tax Rebate কী
- আয়কর রেয়াত পাওয়ার নিয়ম
- কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করলে ট্যাক্স কমে
- কত টাকা বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ রেয়াত পাওয়া যায়
- আয়কর আইনের প্রাসঙ্গিক ধারা
- গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা ও ট্যাক্স পরিকল্পনা
Investment Tax Rebate কী?
Investment Tax Rebate বা বিনিয়োগজনিত আয়কর রেয়াত হলো এমন একটি কর সুবিধা যার মাধ্যমে সরকার অনুমোদিত কিছু খাতে বিনিয়োগ করলে নির্ধারিত হারে আয়কর কমানো যায়।
বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ৭৮ এবং ষষ্ঠ তফসিলের (6th Schedule) তৃতীয় অংশ অনুযায়ী বিভিন্ন বিনিয়োগ ও অনুদানের বিপরীতে এই রেয়াত পাওয়া যায়।
সহজভাবে বললে, আপনি যদি সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করেন, তাহলে আপনার প্রদেয় আয়কর কমে যাবে।
কেন Investment Tax Rebate গুরুত্বপূর্ণ?
Investment Tax Rebate শুধু কর সাশ্রয়ের সুযোগই নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনার একটি কার্যকর উপায়।
এর মাধ্যমে আপনি:
- বৈধভাবে আয়কর কমাতে পারবেন
- ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় গড়ে তুলতে পারবেন
- অবসরকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন
- ঝুঁকি অনুযায়ী বিনিয়োগ বেছে নিতে পারবেন
- পরিবার ও সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারবেন
আয়কর কমাতে কোথায় বিনিয়োগ করবেন?
নিচে বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব বিনিয়োগে আয়কর রেয়াত পাওয়া যায় সেগুলো আলোচনা করা হলো।
১। জীবন বীমা প্রিমিয়াম (Life Insurance Premium)
নিজ, স্ত্রী/স্বামী এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের নামে প্রদত্ত জীবন বীমা প্রিমিয়ামের বিপরীতে আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়।
তবে সাধারণত বীমার Sum Assured এর ১০% পর্যন্ত প্রিমিয়াম বিনিয়োগ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়।
কেন এটি জনপ্রিয়?
- কম ঝুঁকিপূর্ণ
- ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে
- একই সাথে ট্যাক্স সেভিংস
২। সঞ্চয়পত্র (Shanchaypatra)
বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যাক্স সেভিং ইনভেস্টমেন্টগুলোর একটি হলো সঞ্চয়পত্র।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ:
- তুলনামূলক নিরাপদ
- নির্দিষ্ট মুনাফা প্রদান করে
- আয়কর রেয়াত সুবিধা দেয়
বর্তমানে নির্দিষ্ট সীমা ( বার্ষিক ৫ লক্ষ) পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকে আয়কর রেয়াতের জন্য গ্রহণযোগ্য ধরা হয়।
৩। DPS (Deposit Pension Scheme)
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের DPS স্কিমে বার্ষিক নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বিনিয়োগ আয়কর রেয়াতের জন্য বিবেচিত হয়।
DPS এর সুবিধা:
- ছোট অংক থেকে শুরু করা যায়
- মাসিক সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি হয়
- নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে বড় অংকের টাকা পাওয়া যায়
বর্তমানে বার্ষিক ১২০,০০০ টাকা পর্যন্ত DPS স্কিমে বিনিয়োগকে আয়কর রেয়াতের জন্য গ্রহণযোগ্য ধরা হয়।
৪। Universal Pension Scheme (UPS)
Universal Pension Scheme বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত বিনিয়োগ ও সঞ্চয় প্রকল্প।
সরকার ঘোষিত এই স্কিমে বিনিয়োগ করলে:
- অবসরকালীন পেনশন সুবিধা পাওয়া যায়
- আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়
- দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি হয়
UPS এ বিনিয়োগের বিপরীতে আয়কর রেয়াতের সুবিধা রয়েছে। এক্ষেত্রে বর্তমানে বিনিয়োগের কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই অর্থাৎ আপনি যে কোন পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন।
৫। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ (Capital Market Investment)
শেয়ার বাজারে বিনিয়োগও আয়কর রেয়াত পাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এক্ষেত্রে বর্তমানে বিনিয়োগের কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই অর্থাৎ আপনি যে কোন পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন।
এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:
- IPO
- Listed Shares
- Secondary Market Investment
বর্তমানে মূলধনী মুনাফার ক্ষেত্রেও বিশেষ কর সুবিধা রয়েছে। শেয়ার বিক্রয় থেকে অর্জিত মূলধনী মুনাফা বা আয় অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত কর অব্যাহতি প্রাপ্ত।
কার জন্য উপযোগী?
- যারা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ রিটার্ন চান
- যারা তুলনামূলক ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত
৬। মিউচুয়াল ফান্ড ও ETF
কোনো ফাইন্যান্স কোম্পানি বা ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ বা সম্পদ ব্যবস্থাপক বা ফান্ড ম্যানেজার কর্তৃক ইস্যুকৃত ইউনিট সার্টিফিকেট এবং মিউচুয়াল ফাল্ড, ইটিএফ বা যৌথ বিনিয়োগ স্কিম ইউনিট সার্টিফিকেটে অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেও আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়।
সুবিধা:
- Professional Fund Management
- Diversified Investment
- তুলনামূলক কম ঝুঁকি
৭। সরকারি বন্ড ও ট্রেজারি বন্ড
Government Treasury Bond, Treasury Bill এবং Debenture-এ বিনিয়োগও আয়কর রেয়াতের আওতাভুক্ত। এই খাতে অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেও আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়।
এগুলো সাধারণত:
- নিরাপদ বিনিয়োগ
- স্থিতিশীল রিটার্ন প্রদান করে
- দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর
৮। SUKUK ও শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ
যারা ইসলামিক শরিয়াহ অনুসরণ করে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য SUKUK বন্ড গুরুত্বপূর্ণ অপশন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) অনুমোদিত SUKUK বন্ড শরিয়াহভিত্তিক সিকিউরিটিজ (Securities)। শরিয়াহভিত্তিক SUKUK বন্ড এ বিনিয়োগ করলে আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়।
SUKUK বন্ড যদি BSEC অনুমোদিত হয় তাহলে এক্ষেত্রে বর্তমানে বিনিয়োগের কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই অর্থাৎ আপনি যে কোন পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন। তবে SUKUK বন্ড যদি সরকার বাজারে ছাড়ে এবং BSEC অনুমোদিত না হয় তাহলে অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ আয়কর রেয়াত পাওয়ার জন্য বিবেচিত হয়।
৯। Provident Fund
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে অনুমোদিত Approved Provident Fund (APF) এ জমাকৃত অর্থও কর রেয়াতের আওতায় আসে। এক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা যে পরিমাণ চাঁদা (contribution) প্রদান করে এবং কর্মী থেকে যে পরিমাণ চাঁদা (contribution) কর্তন করা হয়, উভয় চাঁদার পরিমাণ বিনিয়োগ কর রেয়াতের জন্য বিবেচনা করা হয়।
আর সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে General Provident Fund (GPF) এর জন্য কর্মী থেকে যে পরিমাণ চাঁদা (contribution) কর্তন করা হয়, তা বিনিয়োগ কর রেয়াতের জন্য বিবেচনা করা হয়।
১০। Benevolent Fund ও Group Insurance
Approved Benevolent Fund এবং Group Insurance Premium এর ক্ষেত্রেও কর সুবিধা পাওয়া যায়।
অনুদানের মাধ্যমেও আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়
শুধু বিনিয়োগ নয়, সরকার অনুমোদিত কিছু প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিলেও আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়।
যেমন:
- Zakat Fund
- মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
- CRP
- Ahsania Cancer Hospital
- ICDDR,B
- Thalassemia Foundation
- Centre for Zakat Management (CZM)
ইত্যাদি।
কত টাকা বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়?
আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ৭৮ অনুযায়ী Investment Tax Rebate সাধারণত নিম্নোক্ত তিনটির মধ্যে যেটি কম তার উপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়:
- করযোগ্য আয়ের ৩%
- অনুমোদিত বিনিয়োগের ১৫% শতাংশ
- নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা (১০ লক্ষ)
অর্থাৎ, শুধু বেশি বিনিয়োগ করলেই বেশি রেয়াত পাওয়া যাবে — বিষয়টি সবসময় এমন নয়। সঠিক Tax Planning অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
Investment Tax Rebate পাওয়ার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
১। সঠিক ডকুমেন্ট সংরক্ষণ করুন
যেমন:
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট
- বীমা প্রিমিয়াম রসিদ
- DPS Certificate
- BO Statement
- Mutual Fund Statement
- ক্রয়ের স্বপক্ষে প্রামানিক দলিল (Evidence in support of Purchase)
২। অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করুন
সব ধরনের বিনিয়োগ আয়কর রেয়াতের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
৩। আয়কর রিটার্নে সঠিকভাবে প্রদর্শন করুন
Investment Schedule সঠিকভাবে পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় কিভাবে Investment Tax Rebate বা বিনিয়োগ কর রেয়াত দাবি করতে হয় তা জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন।
ভিডিওটি লিঙ্ক – https://youtu.be/r1qq5lr5l4A
৪। Tax Consultant-এর পরামর্শ নিন
ভুল Tax Planning অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
উপসংহার
বর্তমান সময়ে স্মার্ট Tax Planning অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাতে বিনিয়োগ করলে আপনি যেমন ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক নিরাপত্তা তৈরি করতে পারবেন, তেমনি বৈধভাবে আয়করও কমাতে পারবেন।
তাই শুধু ট্যাক্স সেভিং নয়, দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও Investment Tax Rebate বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আপনি যদি জানতে চান—
“কোথায় বিনিয়োগ করলে ট্যাক্স কমবে?”
তাহলে উপরোক্ত অনুমোদিত খাতগুলো হতে পারে আপনার জন্য কার্যকর সমাধান।
কোথায় বিনিয়োগ করলে ট্যাক্স কমবে - References
- Income Tax Act 2023
- Section 78 of Income Tax Act 2023
- Part 3 of 6th Schedule
- National Board of Revenue (NBR)
- Relevant SROs and Tax Circulars
Share on-

